প্রতিবেদন

সেদিনের সেই বিশাল পুকুরটি এখন শুধুই স্মৃতি
॥ এ এইচ এম নোমান ॥

১৯৬২ সালে আমরাই লাস্ট মেট্রিকুলেশান পাস করি। এরপর থেকে এসএসসি-এইচএসসি সিস্টেম চালু হয়। ১৯৬৩ সালে চৌমুহনী কলেজে ভর্তি হই। প্রথমে কলা বিভাগে, ৩/৪ মাস পর ভবিষ্যৎ কর্মঅগ্রাধিকার বিচারে বাণিজ্য বিভাগে আসি। যারা দূর-দূরান্তের দ্বীপ, চরাঞ্চল থেকে পড়ালেখা করতে এসেছি, সচ্ছলরা হোস্টেলে এবং অন্যরা বেশিরভাগ লজিং ও মেস করে থাকতো। চৌমুহনী এসেই হোস্টেলে সিট পাইনি, কয়েক মাস বাজারের মেইন রোডে নান্টু বাবুদের সাহা মেডিকেল হলের পিছনে চকিপাতা এক রুমে থাকতাম। কয়েক মাস পর ওল্ড হোস্টেলে সিট পেলাম, ১৮ নং কক্ষ, ৪ সীটের রুম; আমি, হাতিয়ার অতুল বাবু এবং রামগতির জসীম সাহেব। তারা উভয়ে ডিগ্রি ক্লাসের, জসীম উদ্দিন আহমদ ডাকসাইটে ছাত্রলীগ নেতা। একরোখা জেদী, নীতিবাগীশ। তিনিই আমাকে সীট পাওয়ায় সহযোগিতা করেন, এভাবেই ছাত্রলীগে সম্পৃক্ত হওয়া। হাতিয়ার অতুল বাবু থেকে প্রথম টাই বাঁধা শিখেছি। জসীম ভাই ভাল গান গাইতেন- একটা গান লিখো আমার জন্য, না হয় তোমার কাছে ছিলেম অতি নগণ্য......।

হাফ-ওয়াল টিনশেড হোস্টেল। পেছনেই বিশাল পুকুর। এক পাড়ের মানুষ অন্যপাড় থেকে ভালভাবে চেনা যেত না। পুকুরের উত্তর পাড়ে এক আধাখেঁছড়া ঘাটলায় গোছল করতে হত। জেনেছি ইতোমধ্যে বিশাল পুকুরটি ভরাট করে ফেলেছে। সেখানে ইট সুরকীর দালান কোঠা উঠেছে। কার মালিকানা, কারা থাকে, জানি না। এত বড় পানির আধার, মাছে ভরা পুকুর, এভাবে স্থান নিশানা মুছে দিয়ে ভরাট করে সুন্দর পরিবেশকে নষ্ট করে দিল। এটা ভেবে মনটা কেঁদে ওঠে। বর্তমানে জলবায়ুর পরিবর্তন নিয়ে কত হৈ চৈ। গাছের গোড়া কেটে আগায় পানি ঢালার মত। সারাদেশে এভাবে প্রায় সকল খাল-বিল, পুকুর-ডোবা, নদী-ঝিল ভরাট, দখল, বর্জ্য ময়লা নিষ্কাশন, কালো ধোঁয়া, শব্দ দুষণ ইত্যাদি গর্হিত ও পরিবেশ বিরোধী জঘন্য কাজ করেই চলেছি আমরা। বর্তমান সচেতন যুব ও ছাত্র সমাজকে এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার আহবান জানাচ্ছি।

পুকুরের পাশেই ছিল ডাইনিং রুম। একটু দূরে আধা-পাকা খোলা ল্যাট্রিন! হোস্টেল উত্তর-দক্ষিণে লম্বা-লম্বি। একেবারে দক্ষিণ পাশের কক্ষ ছিল নামাজের স্থান। তার পরেই হোস্টেল সুপারসহ ৪/৫ জন প্রফেসরের আবাসিক টিনের বাসা। হোস্টেল মাঠে রিং ও বেডমিন্টন খেলতাম। আর ২/১ জনের রুমে ‘ফিস’ তাস খেলা হতো। হোস্টেল সুপার আবদুল্ল্যাহ সাহেব মাঝে মধ্যে রাতে পরিদর্শনে আসতেন। তাস খেলা অবস্থায় দেখলে রাগ করতেন। বাই রোটেশনে বারান্দায় পাহারা দিতাম, যাতে স্যার আসলে খেলারত না দেখে। হোস্টেলের সামনে কিছুটা মাঠ, কাটা তারের লম্বা-লম্বি বেড়া। বেড়ার বাহির দিক দিয়ে ভাঙ্গা ইটের সরু রাস্তা। হোস্টেলের দক্ষিণ পার্শ্বের স্যারেরা ও তাদের ছেলে-মেয়ে আত্মীয়রা এ রাস্তায় যাতায়াত করত। আমাদের সঙ্গে পড়ে এক স্যারের ঘনিষ্ট আত্মীয়। নাম কাঁকন (মূল নাম নয়) সেলোয়ার কামিজ এবং মাঝে মধ্যে নীল, সবুজ, সাদা, লাল মেচিং শাড়ী পরে বুকে বইসমূহ ধরে কলেজে যাতায়াত করত এই সরু রাস্তা দিয়ে নিয়মিত। হোস্টেলের প্রায় সবাই টিনের খিড়কির ফাঁক দিয়ে আড়ালে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখত। এতটুকুই! এর বেশি কিছু আর হওয়া কি সম্ভব ছিল তখন? ফর্সা, ছিপছিফে গড়ন, হরিণ আঁখি, সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে ভীরু পায়ে হেঁটে চলা। কাঁচা, আধা ভাঙ্গা ইট ঘাস বিছান, সরু সড়ক দিয়ে কলেজে যাতায়াত, এখনও যেন চোখে ভাসে। একমাত্র সিনেমা হল ‘রূপভারতী’-তে কনসেশনে সিনেমা দেখতাম দলবেঁধে। ইন্ডিয়ান উত্তম-সুচিত্রার বাংলা কোন ছবিই বাদ যেত না, হিন্দীসহ অন্যত ছিলই। একটা ছবি পাঁচ বারও দেখেছি।

সে সময় মাইজদী, সোনাইমুড়ী থেকে ছাত্ররা ট্রেনে যাতায়াত করত। ছাত্ররা প্যান্ট শার্ট পরত, তবে লুঙ্গী শার্ট পরে আসার সংখ্যাও কম ছিল না। আমাদের সঙ্গে ফার্স্ট ইয়ারে কলা বিভাগে মেয়েদের সংখ্যা খুব কম ছিল। যতটুকু মনে আসে ১৩/১৪ জন ছিল। তাও কমার্সে আসার পর একজনও ছিল না। শিক্ষক কক্ষের পাশে কমন রুম ছিল। ঘন্টার সঙ্গে মেয়েরা শিক্ষকের পেছনে পেছনে বিষয়ভিত্তিক ক্লাসে ২/৩টা হাইবেঞ্চ খালি থাকত, সেখানে এসে বসত। ক্লাস শেষ হলে আবার পেছনে পেছনে কমন রুমে চলে যেত।

সদা হাসি-খুশি রসিক অধ্যক্ষ টি হোসেন ছিলেন খুবই ছাত্রপ্রিয়। সকলের কাছে গ্রহণীয় ও সমাদৃত। মাথায় হ্যাট ও হাতে ছড়ি ব্যবহার করতেন। রসাল ভাষায় বাংলা সাহিত্য পড়াতেন। পাকিস্তানী শাসক আয়ূব বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিভিন্ন সভা-সমাবেশে উজ্জীবিত করতেন সকলকে, হাতিয়ার মঈন ভাই ‘কারার ঐ লৌহ কপাট, ভেঙ্গে ফেল কররে লোপাট, লাথি মার ভাংরে তালা যত সব বন্দী শালা, আগুন জ্বালা, আগুন জ্বালা...’ এই গানটি গাইতেন; তা যেন এখনও কানে বাজে।

আমরা যারা রামগতির আলেকজান্ডারসহ বিভিন্ন স্থান থেকে পা-গাড়ী, গরুগাড়ী, খেয়া নৌকা, রাতে কোষা নৌকায় আসা-যাওয়া করতাম, তাতে প্রায় দু’দিন লেগে যেত। শান্তির হাট, ওদার হাট হয়ে মাইজদীর কাছে গাব্বার পুল পৌঁছে পরে ৩/৪ মাইল হেঁটে হোস্টেলে পৌঁছতাম। রিক্সা ছিল না। বিদ্যুৎ ছিল না। হোস্টেলে প্রতিদিন সন্ধ্যায় হারিকেনে কেরোসিন দিয়ে যেত এক চাচা, মাস শেষে একবারে পেমেন্ট। হোস্টেলে খাওয়া খরচ হতো মাসে ২৮-৩৪ টাকা। এর মধ্যে প্রতিমাসে একদিন ফিস্ট। যোগাযোগ, ডাক ব্যবস্থা অনেক পেছনে ছিল। একটু হিসেবীরা হোস্টেলে চিড়া, নারিকেল, গুড় দিয়ে সকালের নাস্তা সারত। অনেকে হাত কোরানী দিয়ে নারিকেল বা শুধু চাকগুড় দিয়ে চিড়া পানিতে ভিজিয়ে রেখে প্লেটে নিয়ে মজা করেই সারত সকালের নাস্তা। কেউ আবার মাালেকের কেন্টিনেই ডিম ওমলেট, ডিম ভাজি, ফিরনী পরটা দিয়ে নাস্তা সারত। চৌমুহনী বাজারের একমাত্র সে সময়ের আধুনিক হোটেল-কাম রেস্টুরেন্ট বিউটিতে নাবিস্কো রুটি, মাখন বিক্রি হতো, এটাও খুব কম সংখ্যক সম্পন্নরা রুমে নিয়ে রাখত ও খেত।

বৃহত্তর নোয়াখালীতে ছিল ফেনী ও চৌমুহনী মাত্র এ দুটি কলেজ। এসব এলাকায় আর কোন কলেজ ছিল না। রামগতি-হাতিয়া-ভোলা এলাকার অনেকেই তখন বরিশালের বিএম কলেজ, কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজ বা চৌমুহনী কলেজে ভর্তি হতো। বর্তমান ভোলা জেলাতেও তখন কোন কলেজ ছিল না। বেগমগঞ্জ থানার দূর্গাপুর গ্রামের নুরুল ইসলাম চৌমুহনী কলেজে পড়া অবস্থায় আমার সঙ্গে তার পরিচয় হয়নি। ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ১৯৬৫ সালে ঢাকায় জগন্নাথ কলেজে বি কম -এ ভর্তি হওয়া থেকে এস আর হলে তিনি সহপাঠি ও বন্ধু।

আরেফ আহমেদ যখন সভাপতি, আমি তখন ঢাকা শহর ছাত্রলীগ নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং এস আর হল ছাত্রলীগ শাখার সভাপতি। জগন্নাথ কলেজের তৎকালীন তুখোড় অনলবর্ষী বক্তা ছাত্রনেতা আল-মুজাহিদী, নূরে আলম সিদ্দিকী প্রমুখ। বর্তমান সরকারের কেবিনেট মন্ত্রী রাজিউদ্দীন আহমেদ রাজু তখন জগন্নাথ কলেজ ছাত্র সংসদ ভিপি, আমি সেই সংসদে ছিলাম। সেদিনের ছাত্র সংগঠন ও এদিনের ছাত্র সংগঠন চেতনা ও বৈশিষ্ট্যে অনেক ফারাক।

এস আর হল ছাত্রলীগ শাখার সভাপতি থাকার সময় আমার নামসহ দৈনিক ইত্তেফাকে নিউজ ছাপা হয়। মনে আছে নিউজটি নিয়ে পত্রিকা অফিসে গেলে তালেব ভাই ও সিরাজ উদ্দীন ভাই দেখেই বলেন- এই যে, আমাদের নেতারা, কি খবর নিয়ে.. এ কথা বলেই নিউজ শীটটি হাত বাড়িয়ে নিলেন। পরদিন ছাপা অক্ষরে আমার নামসহ কমিটির নাম পত্রিকায় দেখে কি খুশি ও উৎসাহ! ১৯৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলনের সময় ঐতিহাসিক ৭ জুন আমাদের জগন্নাথ কলেজের ছাত্ররাই নেতৃত্ব দিয়েছিল। আইয়ূব বিরোধী আন্দোলনে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ শোষণ মুক্তির আন্দোলন করতে গিয়ে প্রায় সকলেই তখন কারাগারে। অবশেষে দেশ মুক্ত হলো।

গরীবি হটাও যজ্ঞে ‘র্ডপ’র বিবিধ কাজ- সব মিলে আমি তৃপ্ত। এই আত্মতৃপ্তি যেন পরিবার-গ্রাম-সমাজ-দেশ তথা সকলের জন্য আসে ও সকলের মধ্যে আবর্তিত হয়। ধনী-গরীব বৈষম্য কমে। গরীব মা’দের মাতৃত্বকালীন ভাতা-কেন্দ্রীক সেই ‘স্বপ্ন’ (Sapna-Social Assistence Programme for Non-Assesters) বাস্তবায়ন করতে হবে আমাদের সকলকে। যা উপকূলীয় লক্ষ্মীপুর জেলার চরাঞ্চলীয় উপজেলায় পাইলট স্কীম আকারে চলছে। ২০১০ এর সফল এক বছর পূর্তিতে দিন বদলের সরকারের কাছে ২০ বছরের এক দীর্ঘ মেয়াদী এ ‘স্বপ্ন’ বাস্তবায়ন চাই। তাহলেই মাটি-মানুষ-মালিকানায় বৈষম্যহীন দেশ, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা হবে।
 
     
lbheading